PCOS (Polycystic Ovary Syndrome) & ওভারিয়ান সিস্ট (Ovarian Cyst) নিয়ে কিছু কথা
PCOS (Polycystic Ovary Syndrome)
PCOS (পিসিওএস) বর্তমান সময়ে মেয়েদের একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু জটিল হরমোনজনিত সমস্যা যা এখনকার অনেক মহিলা পেশেন্টদের মাঝেই পাওয়া যায়। তাই নিচে PCOS / ওভারিয়ান সিস্ট (Ovarian Cyst) নিয়ে সহজভাবে কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো।
PCOS কী?
PCOS-এর পূর্ণরূপ হলো Polycystic Ovary Syndrome। এটি প্রজননক্ষম মেয়েদের একটি হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা। এই সমস্যায় ডিম্বাশয়ে পুরুষ হরমোনের (Androgen) আধিক্য দেখা দেয় এবং ডিম্বাশয়ের চারপাশে ছোট ছোট অনেকগুলো সিস্ট (তরলপূর্ণ থলি) তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) হয় না, যা মাসিক অনিয়মিত করে তোলে। এটি মাসিক চক্র, গর্ভধারণ, ত্বক ও চুলে প্রভাব ফেলে।
PCOS কেন হয় ?
PCOS হওয়ার সঠিক কারণ এখনো অজানা, তবে চিকিৎসকরা কয়েকটি বিষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন:
➭ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: শরীরের কোষ যখন ইনসুলিন হরমোন সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, তখন শরীর বেশি ইনসুলিন তৈরি করে। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে বেশি পুরুষ হরমোন তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে।
➭ হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: শরীরে অ্যান্ড্রোজেন (Androgen) এবং এলএইচ (LH) হরমোনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
➭ বংশগতি: মা বা বোনের PCOS থাকলে এটি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
➭ লাইফস্টাইল: অতিরিক্ত ওজন, ব্যায়ামের অভাব, জীবনযাত্রার অনিয়ম এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
PCOS - এর লক্ষণসমূহ কি কি ?
সব মেয়ের ক্ষেত্রে লক্ষণ এক হয় না, তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:
➭ অনিয়মিত মাসিক: সময়মতো মাসিক না হওয়া , ২-৩ মাস পরপর মাসিক বা অনেক দেরি করে হওয়া, কখনো মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
➭ অতিরিক্ত লোম (Hirsutism): মুখ, বুক বা পিঠে পুরুষদের মতো কালো ও ঘন লোম হওয়া।
➭ ব্রণ: মুখে, পিঠে বা বুকে জেদি ব্রণ হওয়া।
➭ চুল পড়া: মাথার সামনের অংশের চুল পাতলা হয়ে যাওয়া।
➭ ওজন বৃদ্ধি: হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যাওয়া (বিশেষ করে পেটের দিকে) এবং তা কমাতে কষ্ট হওয়া।
➭ ত্বকের পরিবর্তন: ঘাড়, বগল বা স্তনের নিচের চামড়া কালো ও খসখসে হয়ে যাওয়া।
➭ গর্ভধারণে সমস্যা: ডিম ঠিকমতো না হওয়ায় গর্ভধারণে দেরি হওয়া।
➭ মুড সুইং বা ডিপ্রেশন
ওভারিয়ান সিস্ট (Ovarian Cyst) দেখতে কেমন?
PCOS থেকে কী কী সমস্যা হতে পারে?
PCOS কিছু ভয়ংকর না। কিন্তু সময়মতো
চিকিৎসা না করালে PCOS থেকে
দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে:
☞ বন্ধ্যাত্ব
(Infertility): নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন না হওয়ায় গর্ভধারণে
সমস্যা হয়।
☞ টাইপ-২ ডায়াবেটিস: ইনসুলিন
রেজিস্ট্যান্সের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়।
☞ হৃদরোগ:
উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরল
বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
☞ মানসিক
সমস্যা: ডিপ্রেশন বা এনজাইটি (উদ্বেগ)।
☞ জরায়ুর ক্যান্সার: দীর্ঘ সময় ধরে মাসিক বন্ধ থাকলে জরায়ুর আস্তরণ (Endometrium) পুরু হয়ে ইউটেরাইন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সময়মতো ও নিয়মিত চিকিৎসায় এসব ঝুঁকি কমানো যায়।
PCOS এর জন্য কী কী পরীক্ষা করতে হয়?
ডাক্তার
সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করেন:
✰ আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG of Lower Abdomen): ডিম্বাশয়ে সিস্ট আছে কি না তা দেখার জন্য।
✰ হরমোন প্রোফাইল: রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে Testosterone, LH, FSH, Prolactin, Thyroid (TSH) ইত্যাদি হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা।
✰ ব্লাড সুগার ও কোলেস্টেরল: ডায়াবেটিস বা হার্টের ঝুঁকির মাত্রা দেখার জন্য।
✰ শারীরিক পরীক্ষা: ওজন, বিএমআই এবং লোমের আধিক্য পর্যবেক্ষণ।
তবে সব রোগীর সব পরীক্ষা কওরা নাও লাগতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী করাতে হবে।
PCOS-এর চিকিৎসা কী?
PCOS সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখানে জীবনযাত্রার পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
👉 ওষুধ: অনিয়মিত মাসিকের জন্য হরমোনাল পিল (Oral contraceptive pills -OCPs) এবং ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণের জন্য মেটফরমিন (Metformin) জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা যাবে না, এতে আবার মাসিক অনিয়মিত হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।
👉 ফার্টিলিটি চিকিৎসা: যারা সন্তান নিতে চান, তাদের জন্য ডিম্বস্ফোটনে সহায়তাকারী ওষুধ দেওয়া হয়।বেশিরভাগ রোগী স্বাভাবিকভাবেই মা হতে পারেন।
👉 লোম ও ব্রণের চিকিৎসা: বেশি লোম / ব্রণের জন্য ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ক্রিম বা লেজার ট্রিটমেন্ট নেয়া যেতে পারে। ফল পেতে সময় লাগে (৩–৬ মাস) ।
👉 লাইফস্টাইল পরিবর্তন: ওষুধের চেয়েও PCOS নিয়ন্ত্রণে লাইফস্টাইল পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
➧ ওজন কমানো: শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫-১০% কমাতে পারলেও পিরিয়ড নিয়মিত হতে শুরু করে।
➧ নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি
বা শারীরিক ব্যায়াম করুন।
➧ পর্যাপ্ত ঘুম: দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম হরমোন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
➧ সুষম খাদ্য: আঁশযুক্ত খাবার, শাকসবজি এবং প্রোটিন বেশি খান। চিনি, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিঙ্কস, ফাস্ট ফুড (পিজ্জা, বার্গার), ময়দার তৈরি খাবার (বিস্কুট, সাদা পাউরুটি) এবং অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
➧ মানসিক প্রশান্তি: ইয়োগা বা মেডিটেশন করে মানসিক চাপ মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।
PCOS থাকলে কী করা উচিত?
✔ নিয়মিত
ফলোআপ
✔ ওজন
নিয়ন্ত্রণ
✔ মানসিক
চাপ কমানো
✔ নিজের
শরীরের প্রতি ধৈর্য রাখা
মনে রাখবেন, PCOS মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়, এটা কোনো অভিশাপ নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন এবং মা হওয়া সম্ভব।




Comments
Post a Comment